শুক্রবার, ১ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

৫ প্রবাসীর ২৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক খায়রুল

প্রকাশ: ৬ মে ২০২৩ | ১:১২ অপরাহ্ণ আপডেট: ৬ মে ২০২৩ | ১:১২ অপরাহ্ণ
৫ প্রবাসীর ২৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক খায়রুল

ভিজিট ভিসায় দুবাই এসে ৫ জন প্রবাসীর ২৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ওমান হয়ে দেশে পালিয়ে গেছেন খায়রুল ইসলাম নামের এক প্রতারক। দেশে যাওয়ার প্রাক্কালে তার নিজ পাসপোর্টটি অপর একজনের কাছে দেড়লাখ টাকায় বন্ধক রেখে সেই টাকা পরিশোধ না করে পালিয়ে যান।

প্রতারক খায়রুলের পাসপোর্ট নাম্বার A00681965। পাসপোর্টের ঠিকানা অনুযায়ী তার বাড়ি ঢাকা দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায়। তার পিতার নাম আব্দুল গাফফার।

ইতিমধ্যে এ প্রতারণার ঘটনায় খাইরুলকে অভিযুক্ত করে ঢাকায় দায়ের করা করা একটি মামলা পিবিআই তদন্ত করলেও আসামি পক্ষের লোকজন মামলাটিকে উল্টোখাতে পরিচালনার জন্য পুলিশকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগীরা। মামলা তদন্তে গড়িমসি আচঁ করতে পেরে প্রতারিত পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে আরেকটি অভিযোগ ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠিয়েছেন। এই অভিযোগটি ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে তারা জানান।

ঘটনার বিবরণে জানা যায় ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল প্রতারক খাইরুল ইসলাম ভিজিট ভিসায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসেন। দুবাই এসে সর্বপ্রথম নাজমুল শেখ নামে এক ব্যক্তির সাথে তার পরিচয় হয়। ঢাকা থেকে খাইরুল তার পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে নাজমুল শেখের নম্বর সংগ্রহ করেন এবং দুবাই এসে তার বাসায় উঠেন। পূর্ব পরিচিত ওই ব্যক্তি প্রতারিত নাজমুল শেখকে জানান খাইরুলকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। খাইরুল ভাষাগত জ্ঞান এবং কোন কাজ জানে না বিধায় দুবাইতে কোন জায়গায় তার চাকরি হয়নি।

খাইরুলের প্রতারণা কার্যক্রম কিভাবে শুরু হয়?

মাসখানেক দুবাইতে নাজমুলের বাসায় অবস্থান করার পর খায়রুল পরিচিতদের সাথে বিভিন্ন রকম গল্প সাজাতে থাকেন। সে নাজমুলসহ তার বন্ধু-বান্ধবদের জানান গণপূর্ত বিভাগে তার বাবার বিশেষ যোগাযোগ আছে। গণপূর্ত বিভাগ ঢাকার লালমাটিয়ায় জ্যোতি প্লাজা নামে একটি প্লাজা স্থাপন করতে যাচ্ছে। যেখানে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য দোকান বরাদ্দ দেয়া হবে। গনপূর্ত বিভাগের সাথে যেহেতু তার বাবার বিশেষ সক্ষতা রয়েছে সেক্ষেত্রে তার বাবা মাত্র ৩ লাখ টাকা করে এই দোকানগুলো বরাদ্দ নিয়ে দিতে পারবে। খাইরুলের কথা শুনে নাজমুলসহ আরো কয়েকজন প্রলোভনে পড়ে যান। দেশে থাকা স্ত্রী মা-বোনদের কথা চিন্তা করে তারা দোকান নেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। খায়রুলের পরামর্শ অনুযায়ী দোকান নেওয়ার জন্য তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ১২০ টাকা জমা দেন। টাকা পাওয়ার পর খায়রুল দোকান বরাদ্দের কাগজপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন।

দুবাই বসে খায়রুলের মানব পাচারের ফাঁদ

খাইরুল জ্যোতি প্লাজায় গণপূর্ত বিভাগের দোকান বরাদ্দের কথা বলে প্রতারণার পাশাপাশি নাজমুলসহ আরো কয়েকজনকে পর্তুগাল পাঠানোর কথা বলে আরো প্রায় ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এসব লোকজন পর্তুগালের ভিসা হাতে পাইনি। অভিযোগকারীরা জানান তাদের চোখে ধুলা দিয়ে খায়রুল টাকা আত্মসাৎ করেছে। ভিটাবাড়ি, সোনা গয়না বিক্রি করে খায়রুল এর কাছে দেয়া টাকার জন্য তারা এখন ভিখারির মতো ঘুরছে প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে।

দুবাইতে খাইরুলের নানা পরিচয়

দুবাই গিয়ে খাইরুল সবাইকে জানায় সে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য দুবাই এসেছেন। তার বাবা বিএনপি করেন বিধায় প্রশাসন থেকে তার বাবাকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় খাইরুল কে বিদেশ পাঠানোর জন্য। তার বাবার অনুরোধে সে বিদেশে এসেছেন।

যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে খায়রুলকে টাকা পাঠানো হয়:

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড,একাউন্ট নাম্বার ০৭২১৩৩০০১০৮৯৬/ ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড একাউন্ট নাম্বার, ২৯১১৫৮০০০৬৬৮৯/ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড অ্যাকাউন্ট নাম্বার, ২০৫০১৭০০১০০১৩৮৯১৬/ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড,একাউন্ট নাম্বার, ০৭২১৩৩০০১০৮৯৬ /
বিকাশ নাম্বার ০১৬২১৮২২৬৫৪/০১৭৭১৮৯১৮৯২/০১৭২১৩৬৫৭৩৭/০১৬২১৮২২৬৫৪/০১৮৩৩০০৫০০/মাসরিক ব্যাংক পি এস সি,একাউন্ট নাম্বার –০১৯১০০৭৬৭৭৮০ /ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড,একাউন্ট নাম্বার ১১০২১০২৭৬৮০২৭০০১/ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড অ্যাকাউন্ট নাম্বার ১০২৪১০১২৪২৯০৩/ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড,একাউন্ট নাম্বার, ১৫৩৬১০৪০৬৯৬৭৮০০১/ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, একাউন্ট নাম্বার, ০১৬২১৪২২৬৫৪/ব্রাক ব্যাংক লিমিটেড, একাউন্ট নাম্বার, ০১৭৭১৮৯১৮৯২/


ভুক্তভোগীরা জানান এইসব একাউন্টের মাধ্যমে খায়রুল দোকান বরাদ্দের টাকাটা সংগ্রহ করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায় এইসব অ্যাকাউন্টগুলো বেশিরভাগ মহিলাদের নামে, মাত্র দু’একটি একাউন্ট পুরুষের নামে রয়েছে। ধারণা করে হচ্ছে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই প্রতারণাটি করা হয়েছে। এই অ্যাকাউন্ট গুলোর মাধ্যমে ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ১২০ টাকা প্রতারক চক্রের কাছে পাঠিয়েছিল নাজমুল শেখ, জামান মিয়া, আরিফুল হক মিজান, জসিম মিয়া, মোহাম্মদ মামুন মিয়া।

খায়রুলের দুবাই থেকে পলায়ন

২০২২ সালের ২১ শে অক্টোবর খায়রুল দুবাই থেকে পালিয়ে যান, পালিয়ে যাবার পূর্বে পর্যন্ত সেই নাজমুল শেখ ও অন্যান্যদের সাথে একই রুমে অবস্থান করছিল। ২০২২ সালের ৬ জুন খায়রুলের ভাষ্য অনুযায়ী গনপূর্ত বিভাগের করা কথিত জ্যোতি প্লাজার দোকানগুলোর চাবি হস্তান্তরের কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে গ্রাহকদের হাতে চাবি তুলে দেওয়ার কথা বলে নাজমুল সহ অন্যান্যদের আশ্বস্তও করেন খাইরুল। প্রধানমন্ত্রী ৬ জুন চিন সফরে থাকায় চাবি হস্তান্তরের বিষয়টি পিছিয়ে যায় বলে খাইরুল প্রবাসী গ্রাহকদের বলে বেড়ান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে ফিরে আসার পরও চাবি বুঝে না পাওয়ায় খায়রুলের উপর টাকা প্রদানকারীদের চাপ বাড়তে থাকে। উপায়ান্তর না দেখে খাইরুল বার দুবাইতে আব্দুল্লাহ নামে পরিচিত এক কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ীর কাছে দেড় লক্ষ টাকায় পাসপোর্ট বন্ধক রাখে। সে টাকা নিয়ে সে দুবাই থেকে ওমান পালিয়ে যায়। ওমান থেকে সে আউট পাস নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যায়।

প্রতারিতদের আইনি প্রক্রিয়া

এদিকে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগীরা কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন, মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে তদন্তের জন্য। পিবিআইয়ের ইনভেস্টিগেশন অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান আসামি পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যেহেতু বিদেশে ঘটনাটি ঘটেছে সেহেতু তদন্তের ক্ষেত্রে একটু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে বাদী পক্ষের পূর্ণ সহায়তা পেলে মামলাটি সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করা যাবে। অভিযোগকারীরা জানান পুলিশ মামলা তদন্তে গড়িমসি করছে। এমনকি খাইরুলের বাবা আব্দুল গফফার মামলার বাদি আমেনা বেগমকে দেখে নিবে বলে হুমকিও দিয়েছে। প্রতারিতরা অপর একটি অভিযোগ বাংলাদেশ কন্সূলেট দুবাইয়ের মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পুলিশ সুপারের কার্যালয় এটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্পর্কিত পোস্ট