মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১

মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে সিন্ডিকেট হাতিয়েছে ৭ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪ | ৫:৫৪ অপরাহ্ণ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪ | ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে সিন্ডিকেট হাতিয়েছে ৭ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক ভিসায় গমনেচ্ছুক ৪ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর কাছ থেকে প্রায় ৭ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অবৈধ সিন্ডিকেট। জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার নেতাদের অভিযোগ, রুহুল আমিন স্বপনের সিন্ডিকেট একাই ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফি হিসেবে প্রতি কর্মী বাবদ ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা করে নিয়েছে। এ কারণে সরকার নির্ধারিত ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা হলেও কর্মীদের ৫-৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

বায়রা নেতারা বলেন, অবৈধ সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরিও পাননি।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন বায়রার বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) বর্জনকারী নেতারা।

এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর তা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনিয়ম তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যার ফলে দেশের জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত উচ্চ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে, যার মধ্যে বিমান ভাড়া, ভিসা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২০২২ সালে বাংলাদেশের ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয় মালয়েশিয়া। যারা সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। পরে এতে যোগ হয় আরো ৭৫টি বেসরকারি এজেন্সি।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়া থাকা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকদের কর্মী প্রতি ৬ হাজার রিঙ্গিত দিয়ে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র তথা ভিসা কিনে আনে। এর ফলে ভুয়া চাহিদাপত্র অর্থাৎ চাকরি না থাকার পরও কর্মী পাঠানো হয়। বাংলাদেশে কর্মী প্রতি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে।

গত ৩১ মে বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। সরকারের কাছ থেকে ছাড়পত্র পেয়েও যেতে পারেননি ১৭ হাজার কর্মী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন। তদন্ত করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

এই পরিস্থিতিকে ডাকাতি আখ্যায়িত করে রিক্রুটিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, আমরা শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। তারা আমাদের কথা শোনেনি। বর্তমানে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। আশা করছি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বায়রার সংবাদ সম্মেলন থেকে জানা গেছে, রুহুল আমিন স্বপনের নিয়ন্ত্রিত দুটি এজেন্সির নামে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো হয়েছে। কর্মী প্রতি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যাংক রশিদও রয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা খরচ নির্ধারণ করলেও ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করেও অনেক ব্যক্তি মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। মালয়েশিয়া প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ থেকে কৃষি, নির্মাণ, সেবা এবং কারখানার শ্রমিকদের জন্য ভিসা জারি করে।

কৃষি ভিসার জন্য মোট খরচ ৩৫ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ ধরা হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কৃষি শ্রমিকদের কাছ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা চাঁদা নেয়। নির্মাণ শ্রমিক ভিসা কেনার জন্য সর্বাধিক খরচ ৭ হাজার টাকা, অন্যান্য সমস্ত খরচ মোট ৩৫ হাজার টাকা। তা সত্ত্বেও নির্মাণ শ্রমিকদের দিতে হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা। সার্ভিস ভিসার জন্য মোট খরচ ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকার মধ্যে। তবে প্রার্থীদের কাছ থেকে সাড়ে ৬ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। একইভাবে ফ্যাক্টরি ভিসার জন্য মোট খরচ  ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার টাকা, তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো দ্বারা শ্রমিকদের কাছ থেকে ৭ লাখ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেয়।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪২ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন, যাদের প্রত্যেকের খরচ ৬ লাখ টাকার বেশি। এই পরিমাণের মধ্যে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা সিন্ডিকেট ফি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, যা মূলত চাঁদা হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে রুহুল আমিন স্বপনের সিন্ডিকেট মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়।

বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, যারা অভিযোগ করেছেন তারাও কর্মী পাঠিয়েছেন মালয়েশিয়ায়। সেই সিন্ডিকেটে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। যেহেতু মানুষ যেতে পারেনি, তাই আমাদের কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলছি। যেহেতু তারা যেতে পারেনি, তাই এসব নিয়ে একটু বেশিই কথা হচ্ছে। এমনকি ২০১৮ সালে মালয়েশিয়া সরকারের শাটডাউনের কারণে ৫২ হাজার কর্মী যেতে পারেনি। যখনই কোনো সংকট দেখা দেয়, তখনই এই সুযোগটি কাজে লাগানো হয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাই এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট