মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেন নিজ সহোদরা বোন ও ভগ্নিপতি

প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৪ | ১২:৪৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ৯ জুলাই ২০২৪ | ১২:৪৩ অপরাহ্ণ
প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেন নিজ সহোদরা বোন ও ভগ্নিপতি

রক্তের সঙ্গে রক্তের বেঈমানী বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ফেনী জেলার দাগণভূঁঞা থানাধীন এমন ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক চোখে পড়ে। তেমনি ঘটে গেল দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারের সঙ্গে একটি ঘটনা। জাহাঙ্গীর আলমের আপন বোন প্রবাসী ভাইকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই ঘটনা। বর্তমানে সবকিছু হারিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। প্রবাস থেকে দেশে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে লুটপাট করেছেন তার সহায়-সম্পত্তি, টাকা পয়সা ও গহনা। প্রতারণার অভিনব কায়দা অবলম্বন করে হাতিয়ে নিয়েছেন টাকা পয়সা, সম্পত্তিসহ সব কিছুই। আপন বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনা অত্যন্ত কৌশল করে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে হাতিয়ে নিয়েছেন তার ৩ কোটি টাকার সম্পত্তি। জাহাঙ্গীর আলমকে মেরে ফেলার পরিকল্পনাও করেছেন আপন বোন রেজিয়া বেগম ও তার স্বামী নূর ইসলাম।

একই বাপের ঔরশজাত সাত সন্তানের মধ্যে একমাত্র বোন রেজিয়া বেগম। ২০০০ সালে দুবাই অবস্থান করে জাহাঙ্গীর আলম কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ভগ্নিপতিকে সহযোগিতা করেন জাহাঙ্গীর। বোনের সংসার জীবনের করুণ পরিণতি থেকে উত্তরণের জন্য ভগ্নিপতিকে সহযোগিতা করে সাবলম্বী করার প্রয়াস নিয়ে দুবাইতে জাহাঙ্গীর আলম কাজ-কর্ম যুগিয়ে দিয়েছেন নূর ইসলামকে। অভাব, অনটন গোচানোর জন্য বাসের হেলপার ভগ্নিপতি নূর ইসলাম দুবাইয়ে শ্যালকের দ্বারস্থ হলে বোনের সংসারের সুখের জন্য ভগ্নিপতিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। দীর্ঘ পাঁচ বছর বোনের সংসার পরিচালনাও করেন জাহাঙ্গীর। ২০০৬ সালে দুবাই থেকে কূট-কৌশল অবলম্বন করে জাহাঙ্গীর আলমকে ফুসলিয়ে নিজের বাড়ি করার জন্য পর্যায়ক্রমে ৪০ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ধার নিয়েছেন ভগ্নিপতি নূর ইসলাম ও বোন রেজিয়া। পক্ষান্তরে বাড়ি নির্মাণের কথা বলে আরো ৩০ লাখ টাকা ধার নেন ভগ্নিপতি নূর ইসলাম। এতেই ক্ষ্যন্ত নন ভগ্নিপতি নূর ইসলাম গং। ২০০৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় শ্যালকের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগিনা শেখ জাহিদ পলাশ ও শেখ রাসেল পিয়াস। শ্যালকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েও ক্ষ্যান্ত হননি নূর ইসলামের পরিবার।

পক্ষান্তরে, ২০১৮ সালে বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনা নতুন কৌশল শুরু করে। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এবং পরিকল্পিতভাবে জাহাঙ্গীর আলমকে ফাঁদে ফেলেন ওই প্রতারক দম্পত্তি। জাহাঙ্গীর আলমের নামে ৬ শতাংশ জমি কেনার প্রলোভন দেখিয়ে নতুন ফাঁদে ফেলেন নূর ইসলাম ও তার পরিবার। জাহাঙ্গীর আলম বোন ও ভগ্নিপতিকে বিশ্বাস করে জমি কিনে বাড়ির তৈরির স্বপ্ন দেখেন। রাজি হয়ে যান তাদের জমি কেনার প্রস্তাবে। তখন থেকেই ৬০ লাখ টাকা মূল্যমান নির্ধারণ করে জনৈক ফারুক আহমেদের কাছ থেকে ৬ শতাংশ জমি কেনার প্রস্তাব দেন। ধাপে ধাপে দুবাই থেকে টাকা নেওয়া শুরু করেন নূর ইসলাম ও রেজিয়া বেগম। জমির মালিককে টাকা প্রদান করেন এবং মৌখিক বায়নাও করেন জাহাঙ্গীর আলমের নামে। ততক্ষণে অধিকাংশ টাকা ব্যাংক একাউন্ট এবং নগদ ক্যাশের মাধ্যমে বোন এবং ভগ্নিপতির একাউন্টে দুবাই থেকে প্রেরণ করেন জাহাঙ্গীর।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১০ জানুয়ারি ওই ৬ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করেন দাগণভূঞা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। ভগ্নিপতি, বোন এবং দুই ভাগিনা জাহাঙ্গীর আলমকে তথ্য গোপন করে জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ জমি রেজিস্ট্রি হবে বলে বাকি সব টাকা হাতিয়ে নেন। অথচ ওই মাসের ১০ তারিখেই জাহাঙ্গীরের নামের পাশে প্রতারণা করে ভগ্নিপতি নুর ইসলামের নামে ৩ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নেন। তখন জাহাঙ্গীর আলম দুবাইতে অবস্থান করছিলেন। বোন এবং ভগ্নিপতিকে বিশ্বাস করে জমি রেজিস্ট্রি করবার জন্য বিভিন্নভাবে জমির মোট মূল্য ৬২ লাখ টাকা প্রদান করেন জাহাঙ্গীর আলম। এতেও ক্ষ্যন্ত হননি আপন বোন রেজিয়া ও তার স্বামী নূর ইসলাম। শুরু করেন ওই জমিতে বাড়ি তৈরির পরবর্তী ফাঁদ।

জাহাঙ্গীর আলম নিজের জমিতে বাড়ি তৈরি করবেন আশা নিয়ে পা দেন নূর ইসলামের নতুন ফাঁদে। ওই জমিতে বাড়ি তৈরি করতে জাহাঙ্গীর আলমকে টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে পুনরায় বাড়ি তৈরি করবার টাকা প্রদান করতে থাকেন দুবাই থেকে। জাহাঙ্গীর আলমের পূর্বের ক্রয়কৃত ২ লাখ ইট দুবাইতে বসেই ভাগিনা পলাশকে দায়িত্ব দিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করান। এভাবে জাহাঙ্গীর আলম তার ঔরশজাত বোনকে সরল বিশ্বাস করে বাড়ি নির্মাণ করতে কয়েক ধাপে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা প্রদান করেন। যার যথেষ্ট প্রমাণাদি বিদ্যমান রয়েছে। এটাও বোনের অভিনব প্রতারণা ছিলো, যা আপন ভাই জাহাঙ্গীর আলম বুঝে উঠতে পারেননি।

পরবর্তীতে, ২০২২ সালে জাহাঙ্গীর আলম দুবাই থেকে বাংলাদেশে গেলে দেখেন অন্য চিত্র। ততক্ষণে বাড়ি নির্মাণের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। বিভিন্ন কারণে জাহাঙ্গীর আলমের সন্দেহ হলে রেজিস্ট্র অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখেন রেজিস্ট্রিকৃত জমির মধ্যে নূর ইসলাম যৌথ মালিকানায় রেজিস্ট্রি হয়েছে। শ্যালকের টাকা-পয়সা অর্থবিত্ত সব কিছু হাতিয়ে নিয়ে ভগ্নিপতি তার নিজ নামে ৫০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়ে পুরো জমি ভোগ দখল করে আছেন। অথচ পুরো জমির মূল্য ৬২ লাখ, বাড়ি নির্মাণ বাবদ ৫৫ লাখসহ যাবতীয় খরচ জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন রেজিয়া বেগম। বলা চলে, “পরের ধনে পোদ্দারি করা”। এভাবেই নিঃস্ব করে দিয়েছেন দুবাই প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমকে।

এতেও ক্ষ্যন্ত হননি আপন বোন রেজিয়া ও তার স্বামী নূর ইসলাম। এরপর জাহাঙ্গীর আলমকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করার নতুন কৌশল অবলম্বন করেন প্রতারক দম্পতি। সন্ত্রাসী কায়দায় জাহাঙ্গীরকে প্রাণপণে মেরে ফেলার বিশেষ কায়দা তৈরি করে ব্যর্থ হন রেজিয়া বেগম। রেজিয়া বেগম ব্যর্থ হয়ে পুত্র শেখ জাহিদ পলাশ এবং শেখ রাসেল পিয়াসসহ স্থানীয়া ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে কয়েকবার হামলা চালানো হয়। এরপর আপন ভাইকে প্রাণে মারতে না পেরে অন্যায়ভাবে ঠুকে দেন জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৯০ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মিথ্যা মামলা। এবার জাহাঙ্গীর আলমের ওপর নতুন করে খড়গ নামলো। যেনো “মরার ওপর খাঁড়ার ঘাঁ”। বোনকে বিশ্বাস করে বাড়ি নির্মাণ করবার জন্য নিজের ব্যাংক একাউন্টের চেক বই স্বাক্ষর করে বোনকে দিয়েছিলেন। বাড়ির কাজ করতে দাগনভূঁঞার ওই ব্যাংক থেকে যেনো সহজেই টাকা উত্তোলন করে বাড়ি নির্মাণের কাজ করতে পারেন। বোনের কাছে জাহাঙ্গীর আলমের রক্ষিত চেক দিয়ে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্ট. মামলা দায়ের করান রেজিয়া বেগম। যাতে সে জমি দাবি করতে না পারেন এবং দুবাই থেকে যেনো বাংলাদেশে আসতে না পারে। মানবতার নির্মম পরিহাস, আপন ভাইকে স্বর্বসান্ত করে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন বোন রেজিয়া দম্পত্তি। ওই জানুয়ারি মাসেই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে জাহাঙ্গীর আলম ফেনী কোর্টে ২০২১ সালে কাউন্টার মামলা দায়ের করেন বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনাদের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ভাই এবং বোনের দুটি মামলাই চলমান রয়েছে। তখন মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এবং টাকা পয়সাসহ যাবতীয় সম্পত্তি ফেরত চেয়ে আইনি সহায়তাও চান জাহাঙ্গীর আলম।

এলাকায় সুপরিচিত মক্ষীরাণী খ্যাত রেজিয়া বেগমের লোলুপ দৃষ্টির সমাপ্তি হয়নি এখনো। শুরু করেছেন নতুন কৌশল। জাহাঙ্গীর আলম দুবাই থাকায় পরিবারের সকল সদস্যের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধারায় করেছেন আরো একটি মিথ্যা মামলা। যাতে করে টাকা-পয়সা, জমি, গহনা কিছুই ফেরত দিতে না হয় সেই পথ অবলম্বন করেছেন রেজিয়া বেগম, তার স্বামী নূর ইসলাম, ভাগিনা পলাশ ও পিয়াস।

সম্পর্কিত পোস্ট