সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১

দুবাইয়ের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বামীর অর্থ নিয়ে ভাগলেন ‘টিকটকার’ স্ত্রী, মারধর-জোর করে বিচ্ছেদের অভিযোগ

প্রকাশ: ৬ মে ২০২৪ | ২:৫২ অপরাহ্ণ আপডেট: ৬ মে ২০২৪ | ২:৫২ অপরাহ্ণ
দুবাইয়ের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বামীর অর্থ নিয়ে ভাগলেন ‘টিকটকার’ স্ত্রী, মারধর-জোর করে বিচ্ছেদের অভিযোগ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে সোহরাব হোসেন নামের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে দেশে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার স্ত্রী তানিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন সময় কাজে দেশে পাঠানো নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং কৌশলে দেশে নিয়ে ভাড়াটে মাস্তন দিয়ে মারধরের অভিযোগও করেছেন এই প্রবাসী। সেই সাথে পুলিশের বিরুদ্ধে ভোগান্তিতে ফেলে জোরপূর্বক বিচ্ছেদ ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনে—এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সোহরাব দুবাইস্থ বাংলাদেশ কনসুলেটে অভিযোগ দায়ের করেছেন। শুক্রবার ( ৩ মে) বাংলাদেশ কন্সূলেট দুবাইতে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে সোহরাব তার এ মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন। পাশাপাশি তিনি দুবাই পুলিশেও অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া বাংলাদেশ কন্সূলেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট অভিযোগ পাঠিয়েছেন সোহরাব। দুবাইয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটির কাছে বিষয়টি এখন ‘টক অফ দ্যা টাউন’। ভুক্তভোগী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে এই সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী সোহরাব ফেনী সদরের জোয়ার কায়সার গ্রামের নরুল আমিনের সন্তান। বর্তমানে তিনি দুবাইতে কর্মরত আছেন। অভিযুক্ত তানিয়া চাঁদপুরের শাহরাস্তি‘র ইসলামপুর গ্রামের মো. ফিরোজের কন্যা। তিনি দুবাইয়ের কারামা এলাকায় একটি ট্রাভেলে কাজ করতেন।

সোহরাবের লিখিত অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় বছর আগে তানিয়াকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল দুবাইয়ের স্বর্ণ ব্যবসায়ী সোহরাব। দুবাইয়ের কারামা এলাকায় একটি ট্রাভেলে কাজ করার সুবাধে চাঁদপুরের শাহরাস্তির তানিয়ার সাথে তার পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে। তবে তানিয়া এর আগেও একাধিক বিয়ে, একাধিক প্রেম করেছেন বলে সোহরাব জানিয়েছে।

দুবাইতে সোহরাবের টাকা পয়সার লোভে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে তানিয়া পূর্বের সম্পর্কে সবকিছু সোহরাবের কাছ থেকে গোপন রাখে। সোহরাব তানিয়াকে অবিবাহিত মনে করে তার প্রেমে মগ্ন হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে দু’জনের পরিবারের অসম্মতিতে  তানিয়াকে দুবাইতে বিয়ে করে সোহরাব ঘর সংসার করতে থাকেন।

তানিয়ার বাবাও দুবাইতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বিয়ের পর  বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যে তানিয়াকে সম্পৃক্ত করেন সোহরাব। কিছুদিন দিন পূর্বে তানিয়ার নামে দেশে জায়গা ক্রয় করার জন্য তানিয়ার বাবা মো. ফিরোজকে বায়না নামার ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন সোহরাব। ভালোবাসার সম্পর্ককে অটুট রাখতে তারা দুজনেই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ফলে তানিয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে বিয়ের এক বছর পরেই। এভাবেই সব কিছু ঠিকঠাক চলছিলো।

আরও জানা যায়, কিন্তু ঘটনা উল্টো পথে মোড় নেয় গত ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন আগে থেকে। অন্তঃসত্ত্ব অবস্থায় তানিয়ার উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা, টিকটক ও লাইকি ও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ায় তানিয়ার বাবা ফিরোজের কাছে বিচার দেন সোহরাব। এতে তানিয়ার সাথে সোহরাবের কথা কাটাকাটি ও একপর্যায়ে হাতাহাতিও হয়। এরপর থেকে দুজনের মধ্যে মান অভিমানও চলছিল। এর মধ্যে তানিয়ার বাবা উদ্যোগ নিয়ে দু’জনকে মিলিয়ে দেন।

এই ঘটনার পর গত ঈদুল ফিতরে সোহরাব দেশে যান। গত ৮ এপ্রিল সোহরাব ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দুবাই ছাড়েন। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যেতে চাইলে দুবাইতে থাকা তানিয়ার বাবা ফিরোজ  ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকায় তানিয়াকে নিয়ে যেতে বাধা দেন। সোহরাবও তানিয়ার বাবার পরামর্শে স্ত্রীকে সাথে না নিয়ে দুবাইয়ের কারামা অঞ্চলে বসবাসকারী তার শ্বশুরের পরিচিত রেখা আকতার নামে এক মহিলার কাছে রেখে যান ।

অভিযোগে সেহরাব উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের যাওয়ার পর তার স্ত্রী তানিয়া তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সোহরাব স্ত্রীকে না পেয়ে স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে গত ১৭ এপ্রিল তানিয়াকে স্বামীর অবর্তমানে আশ্রয় দানকারী রেখা আকতারের কাছে ফোন দিলে রেখা সোহরাবকে জানান—তার স্ত্রী তানিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে পেটের বাচ্চা নষ্ট করে ফেলেছেন। এতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন সোহরাব। সোহরাব জানায় বাংলাদেশের যাওয়ার সময় তার স্ত্রীর একাউন্টে তার বেশ কিছু টাকা ছিল। তাছাড়া সোহরাবের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার লেনদেন তার স্ত্রী তানিয়ার একাউন্টে করতো বিধায় বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা তানিয়ার একাউন্টে জমা ছিলো। দেশে যাওয়ার সময় ঘরে লকারের চাবি, জমানো টাকা, স্বর্ণালঙ্কার সবকিছু স্ত্রীর কাছে রেখে গিয়েছিলেন সোহরাব। এই বিশ্বাস কাল হয়ে দাঁড়ায় সোহরাবের জন্য।

এদিকে টাকা পয়সা হাত করে তানিয়া সোহরাবের সাথে  যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে সোহরাব উপায়ান্তর না দেখে বারবার তার শ্বশুর ফিরোজের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে। এই সময়  ফিরোজ মেয়ের জামাইকে আশ্বস্ত করেন তানিয়ার সাথে যোগাযোগ করে দেওয়ার। এই কথার প্রেক্ষিতে সোহরাব বাড়ির কাজকর্ম সারতে দেশে রয়ে গেলেও স্ত্রী তানিয়ার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগের জন্য বার বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।

সোহরাব বলেন, গত ২১ এপ্রিল আমি জানতে পারেন তানিয়া তার বাবার সাথে বাংলাদেশে গেছেন। তানিয়া নিজে ফোন করে আমাকেকে বাংলাদেশে যাওয়ার খবরটি জানায়। নিরাপত্তার জন্য বাসার তালা-চাবি, লকারের চাবি, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তানিয়ার বাংলাদেশে নিয়ে গেছে বলেও জানায় আমাকে। আর সেসব নেওয়ার জন্য চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে যেতে বলেন।

তিনি বলেন, তানিয়ার কথা সরল মনে বিশ্বাস করে আমারর শ্বশুরবাড়ি চাঁদপুর যাওয়ার জন্য রওনা হই। পথিমধ্যে তানিয়া জানায়—সে শাহরাস্তিতে নেই,  হাজিগঞ্জ ফুফুর বাসায় বেড়াতে এসেছে। আমি তানিয়ার কথা অনুযায়ী হাজিগঞ্জে যাই। সেখানে গিয়ে পড়তে হয় বড় বিপদে।

সোহরাব জানান, তানিয়ার ফুফুর বাসায় যাওয়ার পর সেখানে তানিয়ার অন্য রূপ ফুটে উঠে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় মাস্তান রাসেলের নেতৃত্বে কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে আটক করে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করেন। সোহরাব টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা তাকে বেদম প্রহার করেন। এরপরও সোহরাবের কাছ থেকে টাকা বের করতে না পেরে তানিয়ার ভাড়াটে মাস্তানরা পুলিশে ফোন দিয়ে সোহরাবকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

এর পর, সোহরাবের থেকে টাকা আদায় করার জন্য জোর প্রচেষ্টা শুরু করেন পুলিশ। গত ২১ এপ্রিল আটক করার পর পুলিশ সোহরাবকে হত্যা, নারী নির্যাতন ও ডাকাতি সহ একাধিক মামলা দেওয়ার ভয় দেখান বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, পুলিশের হুমকি ধমকিতে ভয় পেয়ে দুবাইতে আমার প্রতিষ্ঠানে ফোন করে সাড়ে ৬ লক্ষ টাকা বাংলাদেশ নিয়ে আসি। সেই টাকার সাথে আমার কাছে থাকা ৫০ হাজার সহ মোট ৭ লক্ষ টাকা ২২ এপ্রিল ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে থানার ওসি আব্দুর রাশিদকে দেই।

সোহরাব জানান, আমি থানায় আটক থাকায় এক নিকট আত্মীয়কে নিয়ে হাজিগঞ্জ থানার এসআই বেলাল হোসেন ব্যাংক থেকে  টাকা উত্তোলন করে থানায় নিয়ে আসেন। থানায় ওই টাকা হস্তান্তর করা হয় ওসি আব্দুর রাশিদের কাছে। ৭ লাখ টাকা দেওয়ার পর তানিয়ার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের কথা বলে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে সোহরাবের কাছে থেকে সিগনেচার আদায় করেন ওসি। সিগনেচার না দিলে ১২টি মামলা দিয়ে তাকে চালান করে দেওয়ার হুমকি দেন ওসি আব্দুর রাশিদ। তাছাড়া সোহরাবের ম্যানীব্যাগে থাকা ৫ হাজার দিরহাম ওসি আব্দুর রাশিদ রেখে দেন বলে সোহরাব জানান। এরপর  সোহরাবকে ছেড়ে দিলে তিনি দ্রুত ঢাকা এয়ারপোর্ট হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।

জানতে চাইলে দুবাইস্থ বাংলাদেশ কন্সূলেটের কন্সাল জেনারেল বি এম জামাল হোসেন বিষয়টি বাংলাদেশ কন্সূলেটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান ।

এদিকে এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানার ওসি আব্দুর রাশীদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আসামি এবং ভিকটিমের মধ্যস্থতায় সব কিছু হয়েছে। শাহারাস্তি থানার ঘটনা হাজিগঞ্জ কেন নিয়ে আসা হয়েছে এই জওয়াবে ওসি আব্দুর রাশিদ বলেন ৯৯৯ এ ফোন পাওয়াতে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। টাকা পয়সার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে উল্লেখ করেন।

বিষয়টি জানার জন্য সোহরাবের স্ত্রী তানিয়াকে ফোন দিলে তানিয়া সংবাদকর্মী পরিচয় জেনে কোন জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

তানিয়ার বাবাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার মেয়ে খারাপ সেটা আমি সবসময় বলি। তানিয়া র খারাপ বিষয়টি দেখে তানিয়াকে বিয়ে করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তবে আমি সোহরাবের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেছি এক হুন্ডি ওয়ালাকে দেওয়ার জন্য। জমির জন্য নিয়েছি এ অভিযোগ সত্য নয়।

এদিকে থানা পুলিশ জোর করে সিগনেচার নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করাতে পারেন কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাছাড়া থানায় আটকে রেখে  টাকা আদায় করার বিষয়টিও জঘন্য বলে প্রবাসীরা জানান। এদিকে প্রতারিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী সোহরাব এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে তার শ্বশুর এবং স্ত্রীকে বিচারের আওতায় আনার জন্য দাবি জানিয়েছেন।

সম্পর্কিত পোস্ট