শুক্রবার, ১ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

জালিয়াতি করে আমিরাতে শ্রমিক পাঠানোয় কমছে বাংলাদেশিদের চাহিদা

প্রকাশ: ৬ আগস্ট ২০২৩ | ৬:৫৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২৩ | ৬:৫৭ অপরাহ্ণ
জালিয়াতি করে আমিরাতে শ্রমিক পাঠানোয় কমছে বাংলাদেশিদের চাহিদা

মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তর শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে। গত ৪৭ বছরে দেশটিতে গেছেন ২৫ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি কর্মী। দক্ষ শ্রমিক ভিসা ও ভিজিট ভিসার সুবিধা নিয়ে শুধু চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত আমিরাতে গিয়েছেন ৪২ হাজার ৬২৩ জন বাংলাদেশি কর্মী।

দীর্ঘ ১৩ বছর শ্রম ভিসা বন্ধ থাকলেও আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক শহর দুবাইয়ে দক্ষ শ্রমিকের ভিসা পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। যেসব ক্যাটাগরিতে ভিসা প্রদান করা হচ্ছে, সেখানে শিক্ষাগত সনদ প্রদান বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, আরব আমিরাত সরকার অদক্ষ শ্রমিক চায় না। অদক্ষ শ্রমিকের বিষয়ে আমিরাত অনেকটা নিরুৎসাহিত করছে। কিন্তু দক্ষ শ্রমিক নেওয়ার সুযোগটির অপব্যবহার করছে একটি অসাধু চক্র। চক্রটি রিকশা চালককে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভুয়া সনদ দিয়ে, এমনকি এইচএসসি পাসকে লন্ডনের প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজ্যুয়েশন করার সনদ দিয়ে দেশটিতে পাঠাচ্ছে।

২০১২ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশিদের অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা বিবেচনায় নতুন শ্রম ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। একই ইস্যুতে আমিরাত ছাড়াও সেসময় মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু দেশ বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে যতবারই বাংলাদেশি কর্মী যাবার সুযোগ হয়েছে দেশটিতে ততবারই দালাল ও বিভিন্ন অসাধু চক্র সুযোগের ‘অসৎ’ ব্যবহার করে বৃহত্তর এই শ্রমবাজারকে পুনরায় ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

যদিও বাংলাদেশ মিশন থেকে বরাবরই বলা হয়েছে ‘বন্ধ নয়’ এই শ্রমবাজার। তবে কমেছে অদক্ষ শ্রমিক চাহিদা।

দুবাইয়ের আমের সেন্টারের ম্যানেজার কামাল হোসেন জানান, আমিরাতের দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন ধরনের ভিসা হচ্ছে। তার মধ্যে অধিকাংশই দক্ষ শ্রমিক ভিসা। বিশেষ করে যারা দেশ থেকে সরাসরি আসতে চান তাদের জন্য পেশাদার দক্ষ শ্রমিকের এই ভিসাগুলো চালু রয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভিজিট ভিসায় এসে এসব ভিসা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

এদিকে, যতবার বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন ততবরাই দালাল ও বিভিন্ন অসাধু চক্র এই সুযোগের ‘অসৎ’ ব্যবহার করেছেন। করোনা পরবর্তী সময় আমিরাত বিভিন্ন দেশের নাগরিকের জন্য ভ্রমণ ভিসা উন্মুক্ত করে দেয়। এই ভিসা নিয়ে বহু বাংলাদেশি সেসময় পাড়ি দেন দেশটিতে। পরে ভিসার ধরণ পরিবর্তন করে কর্মসংস্থান ভিসা গ্রহণ করেন অনেকেই।

আবুধাবি বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২২ মেয়াদে ভিজিট ভিসা থেকে কর্মী ভিসায় রূপান্তরের সুযোগ নিয়ে আমিরাতে প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। তবে অভিযোগ আছে, এই সুযোগে বেড়ে যায় দালালদের দৌরাত্ম্য। কিছু অসাধু চক্র কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। ইউরোপে পাঠানোর নামে আদায় করেন ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এমন প্রতারণার শিকার হয়ে পরবর্তীতে কর্মহীন ও অসহায় জীবন অতিবাহিত করতে হয়েছে বহু বাংলাদেশিকে।

ভুয়া সনদ ইস্যুর বিষয়ে আক্ষেপ করে কনসাল জেনারেল বি এম জামাল হোসেন বলেন, ‘আমিরাতে দক্ষ শ্রমিক আসার সুযোগ রয়েছে, দক্ষতা থাকলে আসতে বাধা নেই। কিন্তু অদক্ষ শ্রমিকদের দক্ষ দেখিয়ে নিয়ে আসছে একটি অসাধু মহল। প্রতিদিন কনস্যুলেটে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ ভিসা সত্যায়নের আবেদন আসে। যার সবগুলো দক্ষ শ্রমিকের ভিসা। কিন্তু ভিসা সত্যায়নের সময় শিক্ষাগত যেই সনদ তারা দিয়েছে তা দেখে রীতিমতো বিচলিত আমরা। যতগুলো সার্টিফিকেট যাচাই করেছি, তার শতভাগই ভুয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরে রিকশা চালান, তার সার্টিফিকেট বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দেখানো হচ্ছে। কোনো রকম এইচএসসি পাস অথচ তার সনদ লন্ডনের একটি প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজ্যুয়েশন করা বলা হচ্ছে। যাদের কোনো দক্ষতাই নেই। একজন ক্লিনারকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার দেখিয়ে, একজন নির্মাণ শ্রমিককে নিয়ে আসছে লন্ডনের গ্রেজ্যুয়েশন দেখিয়ে। যদি দক্ষ শ্রমিকের ভিসাগুলোও এবার বন্ধ হয়ে যায় -এই দায় কে নেবে?’

রাষ্ট্রদূত মো. আবু জাফর বলেন, ‘আমরা অনেক সার্টিফিকেট পাচ্ছি, যারা এখানে আসার পর কাজ করতে পারছে না। এগুলোর সঠিকতা যাচাই করতে গেলে অনেক সময় হতাশ হই। সার্টিফিকেটগুলো সবই ভুয়া। নিজেদের ফাঁকি দিতে গিয়ে বিপগ্রস্ত করছি আমরা।’

সম্পর্কিত পোস্ট