মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

কোথায় ফিউচার, এটা তো ফুতুরা !

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২১ | ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৫ অক্টোবর ২০২১ | ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ
কোথায় ফিউচার, এটা তো ফুতুরা !

দুবাই থেকে আবুধাবির মরু অঞ্চল হাবসানে যখন বদলি হয়ে এলাম, মনে হল বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ। এটি আমার প্রবাস জীবনের একেবারে শেষের দিকের কথা। শেষের দিকের তিন বছর আমি একটি কোরিয়ান কোম্পানিতে ছিলাম। আগের কোম্পানিতে মার্কেটিং এ ছিলাম। এখানে ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার। সাইডের গাড়ি, ড্রাইভার সহ গাড়ি সংক্রান্ত সব আমার অধীনে ছিল। ড্রাইভার সংকটের সময় মাঝে মাঝে গাড়িও ড্রাইভ করতে হত।

বিরাট এলাকা জুড়ে ছিল আমাদের ক্যাম্প। দীর্ঘ দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্য আর দেড় কিলোমিটার প্রস্থ ক্যাম্পটায় বেশ কয়েকটি কোম্পানির কয়েক হাজার লোক থাকে। একসাথে বসে পাঁচ’শ লোক খেতে পারে এরকম একটি লেবার মেস। আর দু’শ জন বসে খেতে পারে এরকম একটি স্টাফ মেস। এক’শ জন বসে খেতে পারে এরকম একটি অফিসার্স মেস ছিল। আমি স্টাফ মেসে খেতাম। আমার রুম থেকে মেসে আসতে পনের মিনিট সময় লাগত। মেসের খাবার মোটেই মুখে দেয়া যেতনা। দেখতে খুবই লোভ হত, ক্ষুধা যেন দ্বিগুন বেড়ে যেত। কিন্তু মুখে দিলে মাটি মাটি। ভারতীয় মেস ছিল। চিকেন সিক্সটি নাইন আর ডিমের কারি যেদিন বানাত সেদিন কিছু খাওয়া যেত। না হলে বাইরে গিয়ে আরবি বিরিয়ানি (যেটাকে মজবুজ বলা হয়) খেয়ে আসতাম। বেশিরভাগ সময় রাতে হালকা কিছু খেয়ে চালিয়ে দিতাম।

কত দেশের লোকের দেখা সেখানে, কত ভাষায় গল্প করতে হয়। রুমগুলো সব মাটি থেকে আলগা। ক্যারাবন। কাঠের তৈরি। এখানে মিসরি, লেবানিজ, পাকিস্তানি, ভারতীয়, নেপালি, ফিলিপিনো, শ্রীলঙ্কা ও কোরিয়ান নানা জাতের নানা রঙের মানুষ। নানা কালচার।ক্যাম্পের মুখেই একটি মসজিদ। নির্দিষ্ট কোন ইমাম নেই। যেকেউ জামায়াত পড়াতে পারেন। মজার ব্যাপার হল, এখানে আমিন বড় করে পড়ল না ছোট করে পড়ল কিংবা হাত নাভির ওপরে বাঁধলো নাকি বুকে বাঁধলো এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলে না। যার যার নামাজ সে পড়ছে। কেউ কারও ওপর খবরদারি করছে না।আজান শুনলেই কোরিয়ানি বস কিম ছই এর মাথা খারাপ হয়ে যায়। সে বলে সবসময় আল্লাহ আল্লাহ করলে কাজ করবে কবে ? সাপ্তাহ একবার ফ্রাইডে ঠিক আছে। কিন্তু সকাল সন্ধ্যা আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর এটা কী ? আমরা এই পাগলটার কথাই সবাই হাসতাম। বলতাম, বস আপনি এটা বুঝলে কলেমা পড়ে ফেলতেন। আমরা জানি, কোরিয়াতে কমিউনিস্ট এর ছড়াছড়ি। এরা খানা ,কাজ ও ফুর্তি ছাড়া কিছুই বোঝে না।

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় দিবস। এ উপলক্ষে সরকারি ছুটি। ছুটি পেলেই কোরিয়ানদের মাথায় ভূত চাপে খেলা আর ফুর্তির। কেউ গলফ খেলতে, কেউ টেনিস খেলতে কেউ শরাব আর কাবাবে চুর হয়ে থাকতে ভালবাসে। আমাদের মত আবেগী নয় কোরিয়ানরা। তারা সবখানে প্র্যাক্টিকেল। প্রত্যেকটা কোরিয়ান নাগরিকের সামরিক ট্রেনিং বাধ্যতামূলক। তাই তাদেরকে একটি ধরাবাঁধা সুশৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত দেখেছি। ড্রাইভার সংকট থাকায় মিঃ ছইকে নিয়ে যাচ্ছিলাম হাবসান থেকে ফুজাইরাহ কোম্পানির কোরিয়ান অফিসার্স ভিলায়। আমিরাতের জাতীয় দিবস উপলক্ষে সমগ্র আমিরাতকে নববধূর সাজে সাজিয়েছে। রাস্তায় গাড়ির লাইন। জেবল আলি পার হতেই শেখ জায়েদ রোডের সাত/আট লাইনের সুপ্রশস্ত সড়কে গাড়ি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। এই প্রথমবার দেখলাম রাস্তায় কিছু আরবি তরুণ রঙ নিয়ে হোলি খেলছে। এতদিন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতে চিত্তরঞ্জনের নানা ব্যবস্থা থাকলেও এবার চিত্তরঞ্জনের সাথে সাথে দেহ রঞ্জনও করে দিল। গাড়িটি ধীরগতিতে যখন চলছিল, মিঃ ছই মুগ্ধ নয়নে দুবাইর জাঁকজমক অত্যাধুনিক দালানগুলো, স্টিকার আর পতাকায় সজ্জিত গাড়িগুলো দেখছিলেন। ঠিক এমন সময় একঝাক তরুণ এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে গাড়ির গ্লাস নামাতে বললে মিঃ ছই সৌজন্যতা বশত গ্লাস খুলতেই পেছন থেকে এক তরুণ আবীর থেকে রঙ ছিটিয়ে দিল গাড়ির ভেতর। মিঃ ছই রঞ্জিত হয়ে দ্রুত গ্লাস বন্ধ করে দিলে আমি কিছুটা বেঁচে যাই।আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে জাতীয় দিবসে সেটাই ছিল প্রথম এবং শেষ হোলি খেলা। গাড়ির সব টিস্যু শেষ করেও মিঃ ছই রঞ্জিত দেহ পরিস্কার করতে পারেননি। আমি তার অবস্থা দর্শনে হাসি চাপিয়ে রাখতে পারছিলাম না দেখে ছই আরও ক্ষেপে গিয়ে বলল- ‘দে আর অল পুতাংগানা’ । পুতাংগানা শব্দটা নাকি ফিলিপিনো ভাষার একটি গালি। কোন এক ফিলিপিনো তাকে এই গালিটি শিখিয়েছিল সেই থেকে যখনই ছই ক্ষেপে যেতেন তখন ঐ পুতাংগানা শব্দটা বলে তার দেহের ঝাল মেটাতেন। গাড়ি স্লো হয়ে যাওয়ার কারণ সামনের বুর্জ খলিফা টাওয়ারে লেজার লাইটের নানা নকশা ও লেখা মানুষ পড়ছে ভিডিও করছে। অন্যদিকে আকাশে আতশবাজির নয়নাভিরাম রঙিন নকশা উপভোগ করে করে গাড়িগুলো চলছে।

ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার হিসেবে কোরিয়ানিরা আমাকে সাথে রাখতে বেশ পছন্দ করতেন। কারণ রাস্তায় গাড়ির সমস্যা হলে আমি দ্রুত অন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম। দুবাই, আবুধাবি কিংবা ফুজাইরাহ থেকে হাবসানে কোনো গাড়ি এলে তাদেরকে লোকেশন বুঝিয়ে দেয়াও বেশিরভাগ আমার দায়িত্বে পড়ত। এক্ষেত্রে ভারতীয় ড্রাইভারদের নেট থেকে ম্যাপ প্রিন্ট করে বের করে দিলেই তারা অনায়াসে পৌঁছে যেত। সমস্যা ছিল বাঙালি ও পাকিস্তানি ড্রাইভারদের নিয়ে। তারা কিছুদূর এসেই ফোন করে ‘ভাই আমি অমুক খানে পৌঁছেছি, এখন কোনদিকে যাব?’ তখন ঠিকানা বলতে হয় এভাবে- ওখান থেকে পাঁচটি সিগন্যাল পরে লেফট নেবে, এরপর সেকেন্ড রাইট। তারপর সোজা এলে দুইটা রাউন্ড এবাউট পরে প্রথম লেফট। এভাবে বেশ কয়েকবার ফোন করে তারা।

একদা আমার এক বাঙালি ড্রাইভার ভাই ফুজাইরাহ থেকে হাবসান আসছেন কিছু মালপত্তর নিয়ে। যথারীতি ফোন দিলেন লোকেশনের জন্য কোরিয়ান বসকে। কোরিয়ান বস আমার সাথে যোগাযোগ করতে তাকে বলে দিলে সে আমাকে ফোন দেয়। আমি তাকে সহজভাবে লোকেশন বুঝিয়ে দিয়ে বললাম, এতটুক আসার পর একটা বড় সাইন বোর্ড দেখতে পাবেন যাতে লেখা আছে ফিউচার পার্ক ( FUTURE PARK) ওখানে এসেই কল দেবেন। এটার বিপরীতেই আমাদের কোয়াটার। অপেক্ষা করতে লাগলাম।

ফুজাইরাহ থেকে হাবসান আসতে পাঁচ/ ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। একশ চল্লিশ/ একশ ষাট কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালিয়ে পাঁচ/ ছয় ঘন্টায় পৌঁছে। বাঙালিদের মাঝে মিসড কল কালচারটা বেশি। অনেকে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজের দুঃখ বোঝাতে মিসড কল দিয়ে থাকে। কী অদ্ভুত আমাদের বিবেচনা ও মানসিকতা! নিজের প্রয়োজনে অন্যকে মিসড কল দেয়া কতটুকু সমীচীন ? আমি বাঙালি ভাইটির মিসড কল পেয়ে দ্রুত কোয়াটার থেকে বেরিয়ে গেইটে গেলাম। রাত তখন দশটা। কোথাও কোনো গাড়ি নেই। ভেবেছিলাম তিনি এসেই মিসড কল দিয়েছেন। ফিরতি কল করে বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে ক্রস করে আরও সামনে চলে গেছেন। –কিরে ভাই, আপনি এত আগে চলে গেলেন কেন ? এতবড় বোর্ড ফিউচার পার্ক লেখা রাস্তার পাশেই আই লেবেলে তা’কি আপনার চোখে পড়েনি ? ঠিক আছে, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে আবার পেছনের দিকে আসুন। দুই পাশে মরুভূমি। মরুভূমির বুক চিরে উচু-নিচু ঢালু পথ বেয়ে এই মসৃণ সড়ক। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে গাড়ির হেড লাইট। দ্রুত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি সড়কের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছি যাতে দূর থেকেই চেনা যায়। কাছে আসতেই গাড়িটির গতি ধরে এল। একসময় গাড়ি ব্রেক কষে নেমে এলেন বাঙালি ড্রাইভার বাবু। তাকে বোর্ডটা দেখিয়ে বললাম- এত বড় ফিউচার পার্ক লেখা বোর্ডটা আপনার চোখে পড়েনি। তিনি আমাকে চমকিয়ে দিয়ে বললেন-এটা কী ফিউচার পার্ক নাকি ? এটা তো ফুতুরে পার্ক । আপনিই তো ভুল বলছেন, আমার কি দোষ ভাই। আপনি ফুতুরে পার্ক বললে তো আমি আর আগে যাইতাম না। আমি অন্ধকারে হাসি গিলে কোনো রকমে বললাম সরি ভাই, আমারই ভুল হয়েছে ।

  • সাংবাদিক ও কলাম লেখক
সম্পর্কিত পোস্ট